গাড়ীতে হালকা আওয়াজে বেজে চলেছে এফএম রেডিও। কি যেন আজব একটা গান শোনাচ্ছে। রাস্তাঘাটে বিদঘুটে রকমের জ্যাম। ঢাকা শহরে ট্র্যাফিক জ্যাম নতুন কিছু না, কিন্তু আজকের জ্যামটা একটু অন্যরকম। গাড়িঘোড়া এক চূলও নড়ছে না কিন্তু মানুষজন যেন অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ায়। ভর দুপুর কিন্তু অফিস আদালত সব খালি হয়ে গিয়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন ছোটাছুটি করছে। যেন কালই পৃথিবীর শেষ দিন। এই ট্র্যাফিক জ্যামেই নিজেদের প্রাইভেট কারে বসে রয়েছে রাশাদ আর নওরিন। এক ঘণ্টা ধরে মহাখালী ফ্লাইওভারেই বসে আছে তারা। ছয় মাসও হয়নি বিয়ে হয়েছে তাদের, কিন্তু এর মধ্যেই কি শুরু হয়ে গেলো।
"আচ্ছা আসলেই কি এমন কিছু হতে পারে?”, বিস্মিতভাবে জিজ্ঞেস করলো নওরিন।
"আরে ধুর! ফেসবুকে কে বা কারা কি না কি বলল, আর তুমিও বিশ্বাস করে ফেললে"
"তাহলে এই যে সারাদেশে কারেন্ট নেই?”
"সিম্পল! ন্যাশনাল গ্রিড ফেইল করেছে। এ আর নতুন কি?"
"সবকিছু এভাবে উড়িয়ে দেবার স্বভাবটা ঠিক না"
"তোমারও চব্বিশ ঘণ্টা ফেসবুকে বসাটা ঠিক না। তোমার ইন্টারনেটে বসাটা বন্ধ করতে হবে"
"তাহলে এভাবে মানুষগুলো যে দৌড়াদৌড়ী করছে। এটা কি?”
এবার হাসতে শুরু করলো রাশাদ। হাসতে হাসতেই বললো, “শোন, আমি অনেক ছোট ছিলাম। ৮৪/৮৫ সালের দিকের কাহিনী। হঠাৎ করে বাংলাদেশে ঝিনঝিনা রোগ নামে এক অদ্ভুত রোগ দেখা দিলো। এই রোগ হলে আক্রান্ত মানুষের শরীর মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে শুরু করতো। রোগ আক্রান্ত মানুষের শরীরে সাথে সাথে পানি না ঢাললে পরে নাকি ১০ মিনিটের মধ্যে সেই মানুষ মারা যেত। মজার ব্যাপারটা হলো, এই রোগ নাকি ছোঁয়াচেও ছিল। ধরো এক স্কুলে যদি কোন ছাত্রের ঝিনঝিনা রোগ হয়, তাহলে পুরো স্কুলে এই রোগ ছড়িয়ে পরতো"
"তারপর?”
"তারপর আর কি? পুরো স্কুল ছুটি দিয়ে দিতো। বাঙালীর কাজে ফাঁকি দেয়ার ফন্দি আর কি। এ কিছুই না, একে বলা হয় Mass hysteria”
হাসাহাসি করলেও একশত ভাগ কথাটা উড়িয়েও দিতে পারছে না রাশাদ। কারণ রেডিওতে কিছুক্ষণ পরপরই ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। সাধারণত এফএম রেডিওতে আরজে বৃন্দ ন্যাকা ন্যাকা গলায় বিশ্রী ভাষা ও উচ্চারণে অনেকরকম উদ্ভট কথা বলে, কিন্তু আজকে তাদের গলায় ন্যাকামির লেশমাত্র নেই। আজ তাদের গলা শুনে মনে হচ্ছে যেন আজকেই তাদের চাকরী থেকে বের করে দেয়া হবে। অবশ্য এদের সবকটাকে ঘাড় ধরে রেডিও থেকে বিদেয় করলে খুশিই হবে রাশাদ।
তবে অদ্ভুত আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্য করলো তারা। অন্যান্য দিন যেমন প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, ফুল-পাতা, কফির কাপ, হারিয়ে গেলাম এবং কোমর দোলানি মার্কা গান শোনানো হয় আজকে তার ব্যাতিক্রম হচ্ছে। আজকে দেশাত্মবোধক গান, অনুপ্রেরণামূলক গান, পুরনো চলচিত্রের গান, অনুপ্রেরণামূলক ব্যান্ড সঙ্গীত এবং এমনকি মাঝে মাঝে হামদ নাতও প্রচার হচ্ছে। রমজান মাস ছাড়া এফএম রেডিওতে হামদ নাত সে শোনেনি আগে
খুব একটা ভালো লাগছিলো না তাই রেডিওর আওয়াজ কমিয়ে রেখেছিলো রাশাদ। কিন্তু এক ঘণ্টা ধরে মহাখালী ফ্লাইওভারের উপর বসে আছে তারা গাড়ী নিয়ে। বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত লাগছে, তাই নওরিন রেডিওটার আওয়াজ বাড়িয়ে দিলো। কিছুক্ষণ একটি ব্যান্ডসংগীত হবার পরে একটি ভরাট গলা বলা শুরু করলো,
“একটি বিশেষ ঘোষণা। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াতে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ধারাবাহিকতায় চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে। যদিও আমরা যুদ্ধের শঙ্কামুক্ত তবুও বাংলাদেশের সকল মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে বলা হচ্ছে। আমি আবার বলছি, বাংলাদেশের সকল মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে বলা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সাময়িক, জনসাধারণকে আতংকিত না হতে অনুরোধ করা হচ্ছে। ঘোষণাটি শেষ হলো।"
"আচ্ছা চলো, কিছু কেনাকাটা করা যাক", বলেই গাড়ী বনানীর দিকে ঘুরালো রাশাদ।
যতই চিন্তামুক্ত ভাব ধরুক না কেন, স্বামীর মনের ভাবটা ভালো মতোই বুঝতে পারছে নওরিন। বিয়ের আগের ৫ বছরের সম্পর্ক, মানুষটাকে হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে।
------------------
সুপার শপে সাধারণ দিনের থেকে অস্বাভাবিক রকম বেশী ব্যাস্ততা। ব্যস্ততা বললে ভুল হবে, মনে হচ্ছে মল্লযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। সবাই এমনিতে যা কেনে তার থেকে অনেক বেশী জিনিষপত্র কিনছে। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কেনাকাটা নিয়ে কখনো মানুষের বাকবিতণ্ডা দেখা যায় না এই বিলাসী সুপারশপ গুলোতে কিন্তু আজকে এর ব্যাতিক্রম ঘটছে। ঝগড়াঝাটি থেকে শুরু করে ঘটনা কলার ধরাধরি পর্যন্ত গড়াচ্ছে। নওরিনের আর সহ্য হচ্ছে না ব্যাপারটা।
"প্লিজ চলো এখান থেকে", মনে হচ্ছে এখনি কেঁদে ফেলবে নওরিন
নীরবে সম্মতি দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বের হয়ে গেলো রাশাদ। ভালবাসার মানুষকে কাঁদতে দেখা মোটেই সহজ কাজ নয়। পুরুষ নারীর মতো সহজে ভালবাসতে পারে না। আকর্ষিত হরহামেশাই হয় পুরুষ, কিন্তু ভালবাসার জন্য অনেক রকম গুন একসাথে খুঁজে তারা। আর এসবকিছু যদি কোন নারীর মধ্যে পায় তবে তাকে কোনভাবেই হাতছাড়া করে না। সিংহভাগ পুরুষের জন্য প্রকৃত ভালবাসা অনেকটা এমনই হয়। আর নওরিন রাশাদের কাছে এমনই একজন। তাকে কাঁদতে দেখা সহজ নয়। কিন্তু ভালোবাসা মনের চাহিদা মেটালেও ক্ষুধার জ্বালা অনেক কষ্টের।
"শোন কাঁদতে হবে না। প্লিজ লক্ষ্মী, কান্নাকাটি করে না। আমি একটা জায়গা চিনি যেখানে কিছু খাবার পাওয়া যেতে পারে", রাশাদ শান্ত করার চেষ্টা করছে নওরিনকে।
"কোথাও কিছু পাওয়া যাবে না", কান্না থামিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করছে নওরিন।
"চেষ্টা করতে দোষ কি?”
নওরিন কিছু বলল না। রাশাদ গাড়ী ঘুরিয়ে নদ্দা কাঁচাবাজারের দিকে নিয়ে গেলো। গুলশান-বনানীর ধনী পরিবাররা সাধারণত কাঁচাবাজারের দিকে পা বাড়ায় না। এদের অনেকের কাছেই কাঁচাবাজার হচ্ছে "ফকিন্নিদের" জায়গা। আর ধনীর সন্তানরাতো কাঁচাবাজারের চেহারাও দেখেনি হয়তো কোনদিন। তবে বিপদের দিনে এই কাঁচাবাজারই ভরসা হতে পারে। রাশাদ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তাই সবকিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে।
"বাসায় কতটুকু কি খাবার আছে?”, নওরিনকে জিজ্ঞেস করলো সে।
"ফ্রিজে মাছ আছে ৪ কেজির মতো। মুরগীর আর গরুর মাংস প্রায় ৫ কেজি করে দুটোই। চাল আছে আধা বস্তা। শাকসবজি কতটুকু আছে এখন ঠিক বলতে পারছি না", নওরিন অনেক বিত্তবানের কন্যা। কিন্তু সংসার কিভাবে চালাতে হয় তার সবই জানে। নওরিনের বাবা ব্যাবসায়ি মানুষ, টাকার প্রতিই ঝোঁক বেশী। দেশের থেকে বিদেশেই থাকেন বেশী। কিন্তু নওরিনের মা সংসারী মহিলা, মেয়েকেও বড় করেছেন সেভাবেই।
নদ্দা বাজারেও প্রায় একই অবস্থা। তবে সুপার শপগুলোর থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো। নদ্দা কাঁচাবাজারের সোলায়মান ব্যাপারী রাশাদের পূর্বপরিচিত। নদ্দা বাজারের সবচেয়ে বড় মুদী দোকানগুলোর মধ্যে একটি সোলায়মানের। সোলায়মান মিয়া খুবই হাসি খুশি ধরনের লোক। এই বিপদের দিনেও তার কোন ব্যাতিক্রম দেখা গেলো না। হয়তো ব্যাবসা বেশ ভালোই হচ্ছে তাই মুখে বিশাল এক হাসি। পান খাওয়া লাল লাল দাঁতগুলো বের করে এক বিশাল হাসি দিয়ে স্বাগত জানালো সস্ত্রীক রাশাদকে।
"ভাইয়া, আপনের কথাই চিন্তা করতেছিলাম। জানতাম আপনে আইবেন"
"না এসে তো উপায় নেই রে ভাই। চারিদিকে যা শুরু হয়েছে", রাশাদকে এই পর্যায়ে বেশ চিন্তিত দেখাল।
"শোনেন, আমার মনে হইতাছে ব্যাবাকে হুজুগে নাচতেছে। বাঙালীর কাম। যা বলতেছে এমন কিছুই না। যুদ্ধ হইতাছে দেশের বাইরে। ইন্ডিয়া চায়নাতে অ্যাটম বোম পরলে আমগো আর এমন কি? জিনিষপাতির দাম বাড়বো এই যা। ওইটা তো এমনিতেও বাড়ে", সোলায়মান মিয়াকে বেশ নিশ্চিন্তই দেখাচ্ছে। অথবা জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াতে সে বেজায় খুশি।
"দেখা যাক কি হয়। তুমি আপাতত আমাকে দুই বস্তা আটা দাও"
“আটা শেষ, চাইলও শেষ। ব্যাবাগ লইয়া গেছে। ময়দা নিবেন?”
"দাও"
কর্মচারীকে গুদামঘরে পাঠিয়ে দুই বস্তা ময়দা আনালো সোলায়মান। এরই মধ্যে বাজার ঘেঁটে নবদম্পতি কিনে ফেলেছে এক মাসের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ চা পাতা, চিনি, লবণ, পাউডার দুধ, বিস্কুট, চিড়া, মুড়ি এবং গুড়। এছাড়াও তিনটি হারিকেন, ১০ লিটার কেরোসিন, ১ গাইট মোমবাতি, ৪ বাক্স দিয়াশলাই এবং ৫টি বিশাল সাইজের প্লাস্টিকের ডিব্বা। সবকিছুর দাম প্রায় তিনগুণ রাখা হলো। বিপদের সময়ে অতি পরিচিত সোলায়মান মিয়াও ব্যাবসা করে নেয়। কিন্তু সেই বা কি করবে? বাজারের গুদামঘরের মালিকরাতো আর তাকে ছেড়ে দেবে না। সবকিছুই একটি দুষ্ট চক্রের মধ্যেই পরে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতে বাসা এই নবদম্পতির। বাসায় ফেরার পথে কি মনে করে পাশের ফার্মেসি থেকে রাশাদ কিনে নিলো পানি বিশুদ্ধিকরন হ্যালোজেন ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, প্যারাসিটামল, ঘুমের ঔষধ এবং কিছু অ্যান্টি বায়োটিক। আবারও সেই তিনগুণ দাম। এতো কিছু কেনাকাটা বাড়ী ফিরেও রাশাদের মনে হচ্ছে আরও কিছু কেনার বাকি ছিল। কিন্তু কি মনে করতে পারছে না। কাল হয়তো আবার দ্বিতীয় দফা বাজার যেতে হতে পারে।
রাশাদের মোবাইল ফোনের চার্জ চলে যেতে শুরু করেছে। খুব বেশী হলে আর আধা ঘণ্টা চলবে। এর মধ্যেই কিছু জরুরী কল করে ফেলতে হবে। অবশ্য পাওয়ার ব্যাংক আছে, তবে অনেক বুঝেশুনে চার্জ দিতে হবে। অফিসে কল করে জেনে নিলো যে অফিস নিয়মমাফিকই চলবে। তার আত্মীয় বলতে আছে শুধু এক নানা। নানাকে কেন জানি কল করতে ইচ্ছা হচ্ছে না এখন। ঘটর ঘটর রুটি বেলার শব্দ আসছে রান্নাঘর থেকে। ভেতরে গিয়ে দেখলো আপনমনে রুটি বেলছে নওরিন।
“শোন, আমি কিন্তু সবসময় এই রুটি বেলতে পারবো না। আমাকে দেখে শিখে নাও", কাজ করতে থাকা মেয়েদের মধ্যে অদ্ভুত এক বিরক্তি আর সাময়িক স্বামী বিদ্বেষ কাজ করতে থাকে। নওরিনের ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম হল না।
"হা হা... আচ্ছা"
"খে খে করে হাসলে হবে না। আমি বসে বসে খাওয়াবো আর সাহেব বসে আয়েশ করে খাবেন, তা হবে না"
বেশ মজা পেলো রাশাদ। সে জানে না কেন তবে সেও মন দিয়ে নওরিনের রুটি বেলা দেখতে থাকলো।



