Thursday, September 29, 2016

সেই যুদ্ধের পর (পর্ব ৩)

বুধবার, ১০ অক্টোবর, ২০১

গাড়ীতে হালকা আওয়াজে বেজে চলেছে এফএম রেডিও। কি যেন আজব একটা গান শোনাচ্ছে। রাস্তাঘাটে বিদঘুটে রকমের জ্যাম। ঢাকা শহরে ট্র্যাফিক জ্যাম নতুন কিছু না, কিন্তু আজকের জ্যামটা একটু অন্যরকম। গাড়িঘোড়া এক চূলও নড়ছে না কিন্তু মানুষজন যেন অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ায়। ভর দুপুর কিন্তু অফিস আদালত সব খালি হয়ে গিয়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন ছোটাছুটি করছে। যেন কালই পৃথিবীর শেষ দিন। এই ট্র্যাফিক জ্যামেই নিজেদের প্রাইভেট কারে বসে রয়েছে রাশাদ আর নওরিন। এক ঘণ্টা ধরে মহাখালী ফ্লাইওভারেই বসে আছে তারা। ছয় মাসও হয়নি বিয়ে হয়েছে তাদের, কিন্তু এর মধ্যেই কি শুরু হয়ে গেলো।

"আচ্ছা আসলেই কি এমন কিছু হতে পারে?”, বিস্মিতভাবে জিজ্ঞেস করলো নওরিন।

"আরে ধুর! ফেসবুকে কে বা কারা কি না কি বলল, আর তুমিও বিশ্বাস করে ফেললে"

"তাহলে এই যে সারাদেশে কারেন্ট নেই?”

"সিম্পল! ন্যাশনাল গ্রিড ফেইল করেছে। এ আর নতুন কি?"

"সবকিছু এভাবে উড়িয়ে দেবার স্বভাবটা ঠিক না"

"তোমারও চব্বিশ ঘণ্টা ফেসবুকে বসাটা ঠিক না। তোমার ইন্টারনেটে বসাটা বন্ধ করতে হবে"

"তাহলে এভাবে মানুষগুলো যে দৌড়াদৌড়ী করছে। এটা কি?”

এবার হাসতে শুরু করলো রাশাদ। হাসতে হাসতেই বললো, “শোন, আমি অনেক ছোট ছিলাম। ৮৪/৮৫ সালের দিকের কাহিনী। হঠাৎ করে বাংলাদেশে ঝিনঝিনা রোগ নামে এক অদ্ভুত রোগ দেখা দিলো। এই রোগ হলে আক্রান্ত মানুষের শরীর মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে শুরু করতো। রোগ আক্রান্ত মানুষের শরীরে সাথে সাথে পানি না ঢাললে পরে নাকি ১০ মিনিটের মধ্যে সেই মানুষ মারা যেত। মজার ব্যাপারটা হলো, এই রোগ নাকি ছোঁয়াচেও ছিল। ধরো এক স্কুলে যদি কোন ছাত্রের ঝিনঝিনা রোগ হয়, তাহলে পুরো স্কুলে এই রোগ ছড়িয়ে পরতো"

"তারপর?”

"তারপর আর কি? পুরো স্কুল ছুটি দিয়ে দিতো। বাঙালীর কাজে ফাঁকি দেয়ার ফন্দি আর কি। এ কিছুই না, একে বলা হয় Mass hysteria”
হাসাহাসি করলেও একশত ভাগ কথাটা উড়িয়েও দিতে পারছে না রাশাদ। কারণ রেডিওতে কিছুক্ষণ পরপরই ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। সাধারণত এফএম রেডিওতে আরজে বৃন্দ ন্যাকা ন্যাকা গলায় বিশ্রী ভাষা ও উচ্চারণে অনেকরকম উদ্ভট কথা বলে, কিন্তু আজকে তাদের গলায় ন্যাকামির লেশমাত্র নেই। আজ তাদের গলা শুনে মনে হচ্ছে যেন আজকেই তাদের চাকরী থেকে বের করে দেয়া হবে। অবশ্য এদের সবকটাকে ঘাড় ধরে রেডিও থেকে বিদেয় করলে খুশিই হবে রাশাদ।

তবে অদ্ভুত আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্য করলো তারা। অন্যান্য দিন যেমন প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, ফুল-পাতা, কফির কাপ, হারিয়ে গেলাম এবং কোমর দোলানি মার্কা গান শোনানো হয় আজকে তার ব্যাতিক্রম হচ্ছে। আজকে দেশাত্মবোধক গান, অনুপ্রেরণামূলক গান, পুরনো চলচিত্রের গান, অনুপ্রেরণামূলক ব্যান্ড সঙ্গীত এবং এমনকি মাঝে মাঝে হামদ নাতও প্রচার হচ্ছে। রমজান মাস ছাড়া এফএম রেডিওতে হামদ নাত সে শোনেনি আগে

খুব একটা ভালো লাগছিলো না তাই রেডিওর আওয়াজ কমিয়ে রেখেছিলো রাশাদ। কিন্তু এক ঘণ্টা ধরে মহাখালী ফ্লাইওভারের উপর বসে আছে তারা গাড়ী নিয়ে। বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত লাগছে, তাই নওরিন রেডিওটার আওয়াজ বাড়িয়ে দিলো। কিছুক্ষণ একটি ব্যান্ডসংগীত হবার পরে একটি ভরাট গলা বলা শুরু করলো,

“একটি বিশেষ ঘোষণা। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াতে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ধারাবাহিকতায় চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে। যদিও আমরা যুদ্ধের শঙ্কামুক্ত তবুও বাংলাদেশের সকল মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে বলা হচ্ছে। আমি আবার বলছি, বাংলাদেশের সকল মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে বলা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সাময়িক, জনসাধারণকে আতংকিত না হতে অনুরোধ করা হচ্ছে। ঘোষণাটি শেষ হলো।"

"আচ্ছা চলো, কিছু কেনাকাটা করা যাক", বলেই গাড়ী বনানীর দিকে ঘুরালো রাশাদ।

যতই চিন্তামুক্ত ভাব ধরুক না কেন, স্বামীর মনের ভাবটা ভালো মতোই বুঝতে পারছে নওরিন। বিয়ের আগের ৫ বছরের সম্পর্ক, মানুষটাকে হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে।

------------------

সুপার শপে সাধারণ দিনের থেকে অস্বাভাবিক রকম বেশী ব্যাস্ততা। ব্যস্ততা বললে ভুল হবে, মনে হচ্ছে মল্লযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। সবাই এমনিতে যা কেনে তার থেকে অনেক বেশী জিনিষপত্র কিনছে। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কেনাকাটা নিয়ে কখনো মানুষের বাকবিতণ্ডা দেখা যায় না এই বিলাসী সুপারশপ গুলোতে কিন্তু আজকে এর ব্যাতিক্রম ঘটছে। ঝগড়াঝাটি থেকে শুরু করে ঘটনা কলার ধরাধরি পর্যন্ত গড়াচ্ছে। নওরিনের আর সহ্য হচ্ছে না ব্যাপারটা।

"প্লিজ চলো এখান থেকে", মনে হচ্ছে এখনি কেঁদে ফেলবে নওরিন

নীরবে সম্মতি দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বের হয়ে গেলো রাশাদ। ভালবাসার মানুষকে কাঁদতে দেখা মোটেই সহজ কাজ নয়। পুরুষ নারীর মতো সহজে ভালবাসতে পারে না। আকর্ষিত হরহামেশাই হয় পুরুষ, কিন্তু ভালবাসার জন্য অনেক রকম গুন একসাথে খুঁজে তারা। আর এসবকিছু যদি কোন নারীর মধ্যে পায় তবে তাকে কোনভাবেই হাতছাড়া করে না। সিংহভাগ পুরুষের জন্য প্রকৃত ভালবাসা অনেকটা এমনই হয়। আর নওরিন রাশাদের কাছে এমনই একজন। তাকে কাঁদতে দেখা সহজ নয়। কিন্তু ভালোবাসা মনের চাহিদা মেটালেও ক্ষুধার জ্বালা অনেক কষ্টের।

"শোন কাঁদতে হবে না। প্লিজ লক্ষ্মী, কান্নাকাটি করে না। আমি একটা জায়গা চিনি যেখানে কিছু খাবার পাওয়া যেতে পারে", রাশাদ শান্ত করার চেষ্টা করছে নওরিনকে।

"কোথাও কিছু পাওয়া যাবে না", কান্না থামিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করছে নওরিন।

"চেষ্টা করতে দোষ কি?”

নওরিন কিছু বলল না। রাশাদ গাড়ী ঘুরিয়ে নদ্দা কাঁচাবাজারের দিকে নিয়ে গেলো। গুলশান-বনানীর ধনী পরিবাররা সাধারণত কাঁচাবাজারের দিকে পা বাড়ায় না। এদের অনেকের কাছেই কাঁচাবাজার হচ্ছে "ফকিন্নিদের" জায়গা। আর ধনীর সন্তানরাতো কাঁচাবাজারের চেহারাও দেখেনি হয়তো কোনদিন। তবে বিপদের দিনে এই কাঁচাবাজারই ভরসা হতে পারে। রাশাদ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তাই সবকিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে।

"বাসায় কতটুকু কি খাবার আছে?”, নওরিনকে জিজ্ঞেস করলো সে।

"ফ্রিজে মাছ আছে ৪ কেজির মতো। মুরগীর আর গরুর মাংস প্রায় ৫ কেজি করে দুটোই। চাল আছে আধা বস্তা। শাকসবজি কতটুকু আছে এখন ঠিক বলতে পারছি না", নওরিন অনেক বিত্তবানের কন্যা। কিন্তু সংসার কিভাবে চালাতে হয় তার সবই জানে। নওরিনের বাবা ব্যাবসায়ি মানুষ, টাকার প্রতিই ঝোঁক বেশী। দেশের থেকে বিদেশেই থাকেন বেশী। কিন্তু নওরিনের মা সংসারী মহিলা, মেয়েকেও বড় করেছেন সেভাবেই।

নদ্দা বাজারেও প্রায় একই অবস্থা। তবে সুপার শপগুলোর থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো। নদ্দা কাঁচাবাজারের সোলায়মান ব্যাপারী রাশাদের পূর্বপরিচিত। নদ্দা বাজারের সবচেয়ে বড় মুদী দোকানগুলোর মধ্যে একটি সোলায়মানের। সোলায়মান মিয়া খুবই হাসি খুশি ধরনের লোক। এই বিপদের দিনেও তার কোন ব্যাতিক্রম দেখা গেলো না। হয়তো ব্যাবসা বেশ ভালোই হচ্ছে তাই মুখে বিশাল এক হাসি। পান খাওয়া লাল লাল দাঁতগুলো বের করে এক বিশাল হাসি দিয়ে স্বাগত জানালো সস্ত্রীক রাশাদকে।

"ভাইয়া, আপনের কথাই চিন্তা করতেছিলাম। জানতাম আপনে আইবেন"

"না এসে তো উপায় নেই রে ভাই। চারিদিকে যা শুরু হয়েছে", রাশাদকে এই পর্যায়ে বেশ চিন্তিত দেখাল।

"শোনেন, আমার মনে হইতাছে ব্যাবাকে হুজুগে নাচতেছে। বাঙালীর কাম। যা বলতেছে এমন কিছুই না। যুদ্ধ হইতাছে দেশের বাইরে। ইন্ডিয়া চায়নাতে অ্যাটম বোম পরলে আমগো আর এমন কি? জিনিষপাতির দাম বাড়বো এই যা। ওইটা তো এমনিতেও বাড়ে", সোলায়মান মিয়াকে বেশ নিশ্চিন্তই দেখাচ্ছে। অথবা জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াতে সে বেজায় খুশি।

"দেখা যাক কি হয়। তুমি আপাতত আমাকে দুই বস্তা আটা দাও"

“আটা শেষ, চাইলও শেষ। ব্যাবাগ লইয়া গেছে। ময়দা নিবেন?”

"দাও"

কর্মচারীকে গুদামঘরে পাঠিয়ে দুই বস্তা ময়দা আনালো সোলায়মান। এরই মধ্যে বাজার ঘেঁটে নবদম্পতি কিনে ফেলেছে এক মাসের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ চা পাতা, চিনি, লবণ, পাউডার দুধ, বিস্কুট, চিড়া, মুড়ি এবং গুড়। এছাড়াও তিনটি হারিকেন, ১০ লিটার কেরোসিন, ১ গাইট মোমবাতি, ৪ বাক্স দিয়াশলাই এবং ৫টি বিশাল সাইজের প্লাস্টিকের ডিব্বা। সবকিছুর দাম প্রায় তিনগুণ রাখা হলো। বিপদের সময়ে অতি পরিচিত সোলায়মান মিয়াও ব্যাবসা করে নেয়। কিন্তু সেই বা কি করবে? বাজারের গুদামঘরের মালিকরাতো আর তাকে ছেড়ে দেবে না। সবকিছুই একটি দুষ্ট চক্রের মধ্যেই পরে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাতে বাসা এই নবদম্পতির। বাসায় ফেরার পথে কি মনে করে পাশের ফার্মেসি থেকে রাশাদ কিনে নিলো পানি বিশুদ্ধিকরন হ্যালোজেন ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, প্যারাসিটামল, ঘুমের ঔষধ এবং কিছু অ্যান্টি বায়োটিক। আবারও সেই তিনগুণ দাম। এতো কিছু কেনাকাটা বাড়ী ফিরেও রাশাদের মনে হচ্ছে আরও কিছু কেনার বাকি ছিল। কিন্তু কি মনে করতে পারছে না। কাল হয়তো আবার দ্বিতীয় দফা বাজার যেতে হতে পারে।

রাশাদের মোবাইল ফোনের চার্জ চলে যেতে শুরু করেছে। খুব বেশী হলে আর আধা ঘণ্টা চলবে। এর মধ্যেই কিছু জরুরী কল করে ফেলতে হবে। অবশ্য পাওয়ার ব্যাংক আছে, তবে অনেক বুঝেশুনে চার্জ দিতে হবে। অফিসে কল করে জেনে নিলো যে অফিস নিয়মমাফিকই চলবে। তার আত্মীয় বলতে আছে শুধু এক নানা। নানাকে কেন জানি কল করতে ইচ্ছা হচ্ছে না এখন। ঘটর ঘটর রুটি বেলার শব্দ আসছে রান্নাঘর থেকে। ভেতরে গিয়ে দেখলো আপনমনে রুটি বেলছে নওরিন।

“শোন, আমি কিন্তু সবসময় এই রুটি বেলতে পারবো না। আমাকে দেখে শিখে নাও", কাজ করতে থাকা মেয়েদের মধ্যে অদ্ভুত এক বিরক্তি আর সাময়িক স্বামী বিদ্বেষ কাজ করতে থাকে। নওরিনের ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম হল না।

"হা হা... আচ্ছা"

"খে খে করে হাসলে হবে না। আমি বসে বসে খাওয়াবো আর সাহেব বসে আয়েশ করে খাবেন, তা হবে না"

বেশ মজা পেলো রাশাদ। সে জানে না কেন তবে সেও মন দিয়ে নওরিনের রুটি বেলা দেখতে থাকলো।

সেই যুদ্ধের পর (পর্ব ২)


কুমিল্লা, অক্টোবর ১৯৯০

আলী মিয়া রেডিও টিউন করছে। আলী মিয়া রেডিও যতই টিউন করছে, ততই কু কু জাতীয় বিচিত্র শব্দ আসছে। ৯ বছর বয়েসি রাশাদ অত্যান্ত মনোযোগ দিয়ে সেই কু কু শব্দ শুনছে। যতই শোনে ততই মুগ্ধ হয়, কি যে অদ্ভুত মজা পাচ্ছে রাশাদ তা বলে বোঝানো যাবে না। আবার নিজেও মুখ দিয়ে কু কু কুচুর কুচুর শব্দ করে তা নকল করার চেষ্টা করছে। নাতীর এসব অদ্ভুত কান্ডে আলী মিয়া মজাই পায়।

সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। উত্তাল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চলছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। ধরপাকড় যে কত হয়েছে তা মনে হয় পুলিশও হিসেব দিতে পারবে না। পরিস্থিতি খুবই গরম। কি হবে কিছুই বলা যাচ্ছে না। বিটিভি আর বাংলাদেশ বেতার নীরব ভূমিকা পালন করলেও, বিবিসি এবং ভয়েস অফ আমেরিকা নিয়মিত দেশের পরিস্থিতি জানিয়ে যাচ্ছে। রাশাদ খুবই কৌতূহলী ব্যাপারটি নিয়ে।

"নানাভাই, তুমি কি করছো?”, কৌতূহল আর সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে বসলো রাশাদ।

"বিদেশী রেডিও ইষ্টিশন ধরার চেষ্টা করতাসি"

"বিদেশী স্টেশন কেন?”

"আমরার দেশের ইষ্টিশন তো বন্ধ। আর তারা তো ভুয়াবাজি করে, এর লাগি বিদেশী ইষ্টিশন ধরার চেষ্টা করতেয়াসি"

"তুমি এদেশে বসে বিদেশী স্টেশন ধরতে পারবে?", এ পর্যায়ে আশ্চর্য হয়ে যায় রাশাদ

"পারতাম না কে? রেডিও দিয়া সব দেশের ইষ্টিশন ধরা যায়"

"কিভাবে ধরা যায়, নানাভাই?”

"আমি তো এতো শিক্ষিত না। ত এদ্দুর জানি, রেডিও দিয়া দুনিয়ার সব ইষ্টিশনই ধরন যায়। এইডা সবসময় মনে রাখবি, বিপদের দিনে রেডিও দিয়াই সব খবরাখবর লওন যায়"

Sunday, September 25, 2016

সেই যুদ্ধের পর (পর্ব ১)

পর্ব ১


৪ শীতকালের পরে


সৃষ্টির শুরুতে সৃষ্টিকর্তা কোনপ্রকার রাষ্ট্রীয় সীমা সৃষ্টি করে দেন নি। সুন্দর একটি পৃথিবীই দিয়েছিলেন সব মানুষকে। মানুষই এটার উপর কাটা ছেড়া করে, দাগ টেনে সীমানার সৃষ্টিতে করে দেয়। একই নদীর একপাড় থেকে আরেকপাড়ে যেতে নাকি মানুষের তৈরি ভিসা লাগে। ৯০ এর দশকে রাশাদ যখন এক দুরন্ত কিশোর তখন ঢাকার রাস্তার দেয়ালে "ভিসামুক্ত বিশ্ব চাই" জাতীয় কিছু চিকা দেখতো। কারা এসব চিকা লেখত তা এখন আর রাশাদের মনে নেই। তবে ওই লোকগুলো যদি এখন বেচে থাকে তবে তাদের খুশিই হবার কথা। এখন আর কোথাও যেতে ভিসা লাগে না, যে যেখানে খুশি চলে যেতে পারে। "আমরা সবাই রাজা" অবস্থা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হয়তো খুশি হতেন। যে যেখানে খুশি যেতে পারছে, তবে সহি সালামতে যাওয়াটাই আসল ব্যাপার।


কোন প্রকার বাধা নেই, কোন সীমান্ত নেই, গাড়িঘোড়ার প্যাঁ পোঁ নেই, কোথাও উচ্চস্বরে বাদ্যবাজনা নেই, ট্যাক্স প্রদানের ঝন্ধাট নেই, দপ্তরী কাগজপত্রের বালাই নেই, পুলিশ নেই, প্রশাসন নেই। কে না চায় এমন জীবন? ভালই শোনায়। কিন্তু চাঁদেরও যেমন একটি আধার দিক আছে, এই "ভালো পরিস্থিতিরও" খারাপ দিক রয়েই গেছে। প্রায় ৫ ঘণ্টার উপর হয়ে গেছে ঘুম থেকে উঠেছে রাশাদ, কিন্তু পেটে কিছুই পরে নি। যা জমিয়ে রেখেছিলো তার প্রায় সবই শেষ। দুই টিনের ক্যানে আধা কেজির মতো রেড কিডনি বিন আছে কিন্তু খুব পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে। আরও ৩ দিন ঢাকায় থাকতে হবে রাশাদকে, তাই যা করতে হবে খুব সাবধানে। ৫ বছর পুরনো টিনের ক্যানের সিল খোলা মাত্রই ১ দিনে খাবার পচে যাবে। অবশ্য পচা খাবারে কিছুই আসে যায় না। কারণ খাবার খুঁজে পাওয়াই তো এখন দুষ্কর।


সবকিছুই অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে গত ৫ বছরে। যে ঢাকা শহরে আগে মানুষ আর মানুষ গিজগিজ করতো, সে শহরে এখন ২ দিন পরে একজন মানুষ দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তবে মানুষের দেখা পাওয়াটা অনেক সময় দুর্ভাগ্যেরও হয়ে পরে বটে। এর একটি কারণ আছে অবশ্য। মানুষ এমন এক অদ্ভুত জীব যে ভালো সময়ে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর পেছনে অকাতরে ব্যয় করে, জান্তে কিংবা অজান্তেই করে। কিন্তু মন্দ সময়ে অতি সাধারণ বস্তুর জন্যও ভ্রাতৃহত্যা করতেও পিছপা হয় না। গত ৫ বছরে এই দেখেছে রাশাদ। যে যাকে পারছে মেরে পিটে খাচ্ছে। খাবার, পানি, ঔষধ আর অন্যসব নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য একে অপরকে হত্যা করছে।


প্রচণ্ড নোংরা একটা ঘরে, নোংরা একটি বিছানার উপর বসে আছে রাশাদ। এদিক অদিক ছড়িয়ে রয়েছে নানারকম জিনিষপত্র। উৎকট গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার দশা। যে কেউ মনে করতে পারে এটি আসলে একটি স্টোর রুম। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বিলাসবহুল বাড়ি। রাশাদ আসলেই আর খিদে সহ্য করতে পারছে না। সত্যি বলতে, গত দুদিনও ঠিকভাবে খাওয়া হয়নি। কিভাবেই বা খাবে? কিছুই তো নেই কোথাও। ঢাকা শহরের পরিত্যাক্ত বাজার, দোকান, গুদাম এবং সুপার চেইন স্টোর ঘুরে যা যা জোগাড় করেছিল তা এখন সবই শেষের দিকে। কিন্তু পেট বাবাজী তো মানবে না। স্কাউটিং এ যাবে কিনা চিন্তা করছে রাশাদ। তবে ভয় একটাই, এই ৫ বছর ধরে জমানো সরঞ্জাম যদি চুরি হয়ে যায় তাহলে তো সাড়ে সর্বনাশ। এ যুগ বড়ই নির্মম, এ যুগে কনা পরিমাণ ভুলের মাশুল দিতে হয় প্রাণ দিয়ে। কিন্তু এতদিনের পরিশ্রমতো আর বিফলে যেতে পারে না। তাই ঠিক করলো টহলে বের হবে, যা পাবে তাই লাভ।


বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। এখন কোন মাস মনে নেই আর কারোই, কেউ আর সেভাবে হিসেব রাখে না। তবে এপ্রিল কিংবা মে হতে পারে। আগে এপ্রিল-মে মাসে কাঠ ফাটা গরম পরতো, কিন্তু এখন ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো থাকে। মাঝে মধ্যে তো আরও কম। তাই বলতে গেলে সবসময়ই গরম কাপড় পরে থাকতে হয়। আর গায়ে মুড়িয়ে নিতে হয় চাদর জাতীয় কিছু। যদিও বাংলাদেশের কোনখানেই পারমাণবিক আক্রমণ হয়নি, কিন্তু তেজস্ক্রিয়া সবখানেই ছড়িয়ে পরছে। দিন দিন Rad level বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকা আর বেশীদিন নিরাপদ নয়, বাংলাদেশও নিরাপদ নয়।


রাশাদ গায়ে গরম কাপড় পরে নিলো, পায়ে পরে নিলো একজোড়া গাম বুট। সৌভাগ্যক্রমে এই গামবুট জোড়া খুঁজে পেয়েছে এক স্পোর্টস শপে, একদম নতুনই ছিল। এযুগে নতুন কিছু পাওয়া আকাশ কুসুম চিন্তা ছাড়া কিছু নয়, ছেড়াফাটা যা পাওয়া যায় তাই জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হয়। রাশাদের কাছে একটি অমূল্য রত্ন আছে যা এযুগে খুব একটা মানুষের কাছে নেই, গ্যাস মাস্ক। এর পেছনে রয়েছে এক বিশাল কাহিনী। খুব সাবধানে গ্যাস মাস্কটি পরে নিলো সে। বালিশের নিচে থেকে সাবধানে বের করে আনলো একটি Berretta 92 সেমি অটোমেটিক ৯ মিলিমিটার পিস্তল।


বিছানার নিচে দুটি ট্রাঙ্ক, এর মধ্যে থেকে একটি বের করে আনলো সে। সেখান থেকে একে একে বেরিয়ে এলো এক বিশাল মাপের ছোড়া, বাইনোকুলার, একটি শটগান, এবং নিজের তৈরি করা তীরধনুক। এসব সরঞ্জাম জোগাড় করতে রাশাদের বেশ ক'বছর লেগে গেছে। তবে নিজের সাধারণ জ্ঞানের উপর গড়ে তোলা এই অস্ত্রভাণ্ডার বেশ ভালোই কাজে দিচ্ছে এখন। ঢাকা শহরের ৮০ ভাগ মানুষ যেখানে মরে ভূত হয়ে গেছে, রাশাদ দিব্যি বেঁচে আছে। এই বা কম কি?


নিজেকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে সর্বশেষে মহাভারতের মহাবীর অর্জুনের মতো তীরধনুক এক কাঁধে ঝুলিয়ে নিলো সে। আরেক কাঁধে ঝোলাল ব্যাকপ্যাক। সবশেষে গায়ে পেচিয়ে নিলো কালো রঙের এক মোটা কাঁথা। মাতামহের কাছ থেকে প্রাপ্ত এই একটি সম্পত্তি এখনো সে ধরে রেখেছে। সবকিছু আরেকবার চেক করে নিয়ে অবশেষে বেড়িয়ে পড়লো জীবিকার তাগিদে।


এক এলাকা ছেড়ে আরেক এলাকাতে যাওয়াটি মোটেও নিরাপদ নয়। কুকুর, বিড়াল, বানর শ্রেণীর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে territory marking বলে একটি ব্যাপার আছে। কুকুর কোন নতুন স্থানে গেলে সবখানে মলমূত্র ত্যাগ করে নিজের গায়ের গন্ধ ছড়াতে থাকে। যাতে অন্য কোন কুকুর এসে তার বিচরণ স্থান দখল করতে না পারে। মানুষের ঘ্রাণ শক্তি কুকুরের মতো প্রবল নয়। তবে মানুষেরও টেরিটরি মারকিং এর একটি উপায় আছে। যখন সে দেখে কোনখানে কোন অস্বাভাবিক রকম পরিবর্তন আছে তখনি সে বুঝতে পারে এটি তার স্থান নয়।


দোতালা একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি থেকে নিচে নেমে এলো রাশাদ। এই স্থানকে আগে বনানী বলা হতো, ধনাড্য অভিজাত মানুষের বাসস্থান। বেশ প্রাণচঞ্চল একটি এলাকা ছিল বছর পাঁচেক আগেও। সারাদিন শহুরে ধনীর দুলাল দুলালীদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকতো এ এলাকার শৌখিন রেস্টুরেন্টগুলো। কিন্তু বর্তমানে আশেপাশে কবরের নিস্থব্ধতা ছাড়া আর কিছুই নেই। শুধু বনানী নয়, সম্পূর্ণ ঢাকাই আজ এমন। সারাদেশই এখন এমন, হয়তো... সারা পৃথিবী।


চোখ কান সব খোলা রেখে চারিদিকে ভালভাবে দেখে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে রাশাদ। একটি ভুলে ঘটে যেতে পারে চরম বিপদ। যতদূর দৃষ্টি যায় পরিত্যাক্ত বাড়িঘর ছাড়া কিছু নেই। জুতা খড়ম থেকে শুরু করে মোটরগাড়ী পর্যন্ত রাস্তায় পরিত্যাক্ত অবস্থায় পরে আছে। ধুলোবালির আস্তর পরে গেছে সবকিছুর উপর, রাস্তার নিয়ন বাতি থেকে শুরু করে দোকানপাটের সাইনবোর্ডের উপর ধরেছে ঘন মরিচা। রাস্তার কংক্রিট ফেটে ফুঁড়ে বের হয়েছে হরেক রকম ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। কোনপ্রকার কোন শব্দ নেই চারপাশে। বছর দুয়েক আগে কিছু পাখী উড়তে দেখা যেত, এখন তাও খুব একটা দেখা যায় না। তবে এক ধরনের জিনিষ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, মৃত মানুষের হাড়গোড়। নতুন মৃতদেহ দেখা যায় না। দেখা গেলে বুঝতে হয় আশেপাশেই কেউ রয়েছে।




Original Art by Saad Azim



অত্যান্ত সাবধানে এগুচ্ছে রাশাদ। যেন একেবারেই শব্দ না হয় বুটের। আশেপাশে ওত পেতে থাকতে পারে যে কেউ। প্রায় ২ কিলোমিটার দুরে চলে এসেছে বাড়ি থেকে। মহাখালী ফ্লাইওভার বলা হতো এটাকে একসময়। এখন গাড়িঘোড়াও নেই, তাই এর আর কোন ব্যাবহারও নেই। বলতে গেলে ভগ্নদশা, রক্ষণাবেক্ষণ করার কেউই নেই। লতাপাতা গজিয়ে গেছে পিলারগুলো ধরে, হয়তো ভেঙ্গে পরবে আর বছরখানেকের মধ্যেই। একটি পিলারের নিচে নিরাপদ স্থানে বসে বাইনোকুলারটি চোখে লাগিয়ে দেখতে থাকলো রাশাদ। সামান্যতম নড়াচড়াও অতি সতর্কতার সাথে দেখতে হবে। অতি সামান্য স্পন্দন হতে পারে মৃত্যুর আভাস কিংবা জীবন রক্ষাকারী খাদ্য।


মহাখালীর মোড় ছাড়িয়ে এসেছে রাশাদ। আবার একটি নিরাপদ স্থানে বসে বাইনোকুলারে আসেপাশের পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করছে। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের দিকে কিছু মানুষের দৌড়াদৌড়ি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দৌড়ে কিছুটা সামনে গেল সে। ৪ দিন পর মানুষ দেখছে সে, কিন্তু কি হচ্ছে সেখানে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না এখনো। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে এখানে মানুষের আসার কোথা না। কারণ আসেপাশে কোন প্রকার জনবসতি নেই। ঢাকায় এই মুহূর্তে মাত্র দুটি সংগঠিত জনবসতি আছে। একটি হলো টঙ্গির দিকে, আরেকটি পুরনো ঢাকার দিকে। সোজাসাপটা ভাষায় যেখানে পানি, সেখানেই জনবসতি। কিন্তু এখানে মানুষ কি করছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। কারণ জনবসতির বাইরে খুব কম মানুষ এদিক অদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। অনেকটা যেমন আছে রাশাদ।


রাশাদ আরও কিছুটা সামনে গেলো দৌড়ে। এবার বাইনোকুলারে যা দেখল তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কি হচ্ছে। ধর্ষণ প্রচেষ্টা, এ যুগে খুবই সাধারণ ব্যাপার। "আমরা সবাই রাজা" যেহেতু, তাই "রাজাদের" থামানোর কে আছে? নিরাপদ কভার নিতে নিতে সামনে এগিয়ে চলেছে রাশাদ। যত এগিয়ে যাচ্ছে তত ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে উঠছে।  তিরিশের একটু উপরের বয়সের এক নারী এবং ৯/১০ বছরের এক কন্যাশিশুকে তিনজন পুরুষ ধাওয়া করে এই পর্যন্ত এনেছে। দীর্ঘদিন আধাপেটা খাওয়া রুগ্ন শরীর নিয়ে মহিলা আর শিশুটি কোনভাবে সুবিধা করতে পারে নি। ধরা পরে গেছে। শিশুটি রাস্তার কংক্রিটের উপর আছাড় খেয়ে পরে কান্না করা শুরু করেছে। অবশ্য এই কান্না আঘাতের কান্না নয়, ভয়ের। মহিলাটি হাত জোর করে প্রাণভিক্ষা চাচ্ছে বোঝা গেলো।


রাশাদ এখন প্রায় ৪০ মিটার দুরে রয়েছে ঘটনাস্থল থেকে। একটি পরিত্যাক্ত সিএনজির পেছনে নিরাপদ আশ্রয় নিলো সে। মহিলাকে ধর্ষণ করা শুরু হয়ে গেছে। সগৌরবে এক বীরপুরুষ ধর্ষণ করে চলেছে। একজন ধরে রেখেছে সেই শিশুকে আর আরেকজন শিশুটির দিকে বেশ কুদৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসছে। বোঝা যাচ্ছে নারীর পরেই শিশুটির পালা। কাঁধের ধনুক নামিয়ে নিপুণ হাতে নিশানা করলো শিশুটিকে ধরে রেখেছে যেই বীরপুরুষ তার দিকে। ২ সেকেন্ডের ভিতরে সেই বীরপুরুষের মাথায় বিধে গেলো একটি তীর। আরেক বীরপুরুষ যে তাকিয়ে হাসছিল, তার হাসি হঠাৎ করেই উবে গেলো। কোমর থেকে বিশাল সাইজের এক চাপাতি বের করে চিৎকার দিয়ে উঠলো, "ওই কোন কুত্তার বা......”


শেষ হুঙ্কারটাও ঠিকমতো দিতে পারেনি সে। হুঙ্কার পূর্ণ হবার আগেই বুকের মধ্যে বিধে গেছে প্রায় দু'ফুট লম্বা তীর। মৃত্যু যন্ত্রণাতে কাতরানো শুরু করেছে সেই গুন্ডা। ধর্ষণকারী বীরপুরুষ ততক্ষণে বুঝে গেছে কি হচ্ছে। রণে ভগ্ন দিয়ে কোনভাবে উঠে দাঁড়ালো সে। প্যান্ট পড়ার সময় পেল না সে। পাশে পরে থাকা পিস্তলটা উঠাতে যাবে এমন সময় শুনতে পেলো দরাজ এক গলা, "এক চূলও নড়বে না!"

পেছনে ফিরে তাকাতেই বীরপুরুষ যা দেখলো তাতে ভয়েই তার মুখ নীল হয়ে গেলো। কালো সিক্স পকেট প্যান্ট, নেভি ব্লু রঙের জ্যাকেট আর গ্যাস মাস্ক পরিহিত প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার এক অদ্ভুত মানব শটগান তাক করে ধরে আছে।


"নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো আমার শটগানের নল তোমার বিশেষ বস্তুর দিকে তাক করা", বেশ ঠাণ্ডা কণ্ঠেই বলতে লাগলো রাশাদ, "আমার কথার একচুল এদিক অদিক করেছো অথবা কোন চালাকি করার চেষ্টা করলে নিজেকে আর কোনদিন পুরুষ বলে দাবী করতে পারবে না। পিস্তল তোমার বামদিকে তাই এখন লক্ষ্মী ছেলের মতো ডানদিকে সরে এসো।"


"ভাই! মাফ কইরা দ্যান ভাই", ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলছে বীরপুরুষ।


"বেশি কথা আমি পছন্দ করি না, সরে এসো"


"জ্বি ভাই"


"ধীরে ধীরে। এইতো লক্ষ্মী ছেলে।"


ওদিকে তীর বিধে যাওয়া বীরপুরুষ মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শিশু আর শিশুর মা ভয় আর বিস্ময় মিশ্রিত চোখে দেখছে এই অদ্ভুত মানুষটাকে। গ্যাসমাস্ক পরা কাউকে আগে কোনদিন দেখেনি এরা। শিশুটি এখনো হাল্কা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রাশাদ পিস্তলটি কুড়িয়ে নিলো। ঠিক মতো চেক করে দেখল মাত্র দুটি গুলি আছে এতে। কিছু বুঝে উঠার আগেই ধর্ষণকারী বীরপুরুষের খুলি বরাবর গুলি চালিয়ে দিলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়লো বীরপুরুষের নিথর দেহ।


তীরবিদ্ধ বীরপুরুষ নড়াচড়া করবার চেষ্টা করছে কিন্তু কোনভাবেই সুবিধা করতে পারছে না। কিছু হিন্দি ও তামিল ছবিতে আগে দেখা যেত বুকে গুলিবিদ্ধ কিংবা তরবারির আঘাতের পরেও নায়ক উঠে দাড়িয়ে বীরপুরুষের মতো যুদ্ধ করছে। কিন্তু বাস্তবে যে তা একেবারেই অসম্ভব তা এই মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর মানুষটিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আধাপেটা খাওয়া মানুষের বুকের বাম পাশে যদি এক বিশাল তীর এসে ঢোকে তবে তার উঠে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, রক্তপাতের কারণে কথাই বন্ধ হয়ে যাবে। তবুও শেষ মুহূর্তের রাগ চেপে না রাখতে পেরে বলেই বসলো সে, "তুই জানোস না আমরা কারা, যদি আমার বস জানে তাইলে দেখিস তোর কি হয়"


“Perfect last words for a coward", বলেই বিশাল ছোড়াটি কোমর থেকে বের করে শান্তভাবে বীরপুরুষের বুকে বসিয়ে দিলো রাশাদ। নিথর হয়ে পড়লো তার দেহ।


নিজের পছন্দের ছোড়াটি ঠিক মতো পরিষ্কার করে নিলো সে। এরপর নির্বিকার ভঙ্গিতে ধর্ষক দলের পকেট হাতরে খুঁজতে থাকলো। যেন কিছুই হয় নি। শিশুকন্যাটি বিস্ময়ভরে দেখছে এই অদ্ভুত মানবকে। ওদিকে কোনমতে নিজেকে গুছিয়ে নেয়া শুরু করেছে মহিলাটি। বাচ্চাটি একটু ভয় নিয়েই দৌড়ে চলে গেলো মায়ের কাছে। এরই মধ্যে রাশাদ গুন্ডাবাহিনীর পকেট হাতরে পেয়েছে দুটি লাইটার, একটি টর্চলাইট আর কিছু তাজা শটগানের গুলি। সবচেয়ে অমূল্য যে জিনিষ পাওয়া গেছে তা হলো দুই প্যাকেট সিগারেট আর তিনটি সিগার। এযুগে সিগারেট খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর।


পকেট চেক শেষ করে এবার বীরপুরুষদের ব্যাকপ্যাক ঘাটতে শুরু করলো রাশাদ। মহিলা ও শিশুটির দিকে খেয়ালই করছে না সে। মহিলা সম্ভ্রম ঢাকা শেষ করে কৃতজ্ঞতার স্বরে বলতে লাগলো, "আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এই যুগে কেউ কারো জন্য এগিয়ে আসে না। আপনি আমাদের জীবন বাঁচিয়েছেন, আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবো বুঝতে পারছি না"


"ধন্যবাদ দিতে হবে না, আমি আপনাদের বাঁচাতে আসি নি", নির্বিকার ভঙ্গিতেই ব্যাগ ঘাটতে ঘাটতে জবাব দিলো রাশাদ।


"মানে? এর মানে আপনিও কি!? প্লিজ দেখুন, আপনি আমার সাথে যা খুশি করুন, বাধা দেবো না। কিন্তু দয়া করে আমার বাচ্চাটাকে কিছু করবেন না"


কোন উত্তর দিলো না সে, বরং গ্যাসমাস্ক খুলে ফেললো। বেড়িয়ে এলো এলোমেলো করে কাটা ছোট ছোট কাঁচাপাকা চূলের শ্মশ্রুমণ্ডিত লম্বাটে চেহারা। ৩৭/৩৮ বছর বয়স হবে। বোঝা যাচ্ছে কোনসময় বেশ ফর্সা ছিল গায়ের রং কিন্তু এখন রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। এক ব্যাগে ২ কেজির মতো ময়দা আর ৭ প্যাকেট বাদাম পাওয়া গেছে। গন্ধ নেবার জন্য গ্যাসমাস্ক খুলেছে সে। ঠিক মতো পরীক্ষা করে বুঝল বেশ তাজা অবস্থাতেই আছে। ৪ লিটারের মতো পানিও পাওয়া গেছে।


ওদিকে মহিলা বলেই চলেছে, "আপনি কিছু বলছেন না কেন? দেখুন আমি কোন বাধা দেবনা। আপনাকে শিক্ষিতই মনে হচ্ছে, প্লিজ আমার বাচ্চাটাকে কিছু করবেন না"


"অস্থির হবার কিছু নেই। আমি কাউকেই কিছু করবো না", শান্তভাবেই বলতে লাগলো সে, "আপনাকে ডাকাত ধরেছিল বুঝতেই পারছেন। আর ডাকাত এযুগের ভালো শিকার। সবসময়ই খাবার থাকে এদের সাথে"।


বলেই ৪ প্যাকেট বাদাম ছুড়ে দিলো শিশুটির দিকে। কোনকিছু চিন্তা না করেই গোগ্রাসে খেতে লাগলো শিশুটি। রাশাদ গ্যাস মাস্ক পরে আবার চট তৈরি হয়ে নিলো। তার যা প্রয়োজন ছিল পেয়ে গেছে। ফিরে যাচ্ছে সে। মহিলাটি লাজলজ্জার মাথা খেয়ে বলে বসলো, "আমি কি আপনার সাথে আসতে পারি?”


"না"